আফ্রিকা মহাদেশের প্রথম মসজিদে কিছুক্ষণ by জিয়া হাবীব আহসান
![]() |
| ঐতিহাসিক আমর ইবনুল আ’স মসজিদ |
মিশর
নবী রাসূল , সাহাবায়ে কেরাম ও আইয়ামে মুজতাহিদীনদের পদরেনু ধন্য দেশ।
সম্প্রতি দেশটি সফরকালে আফ্রিকার প্রথম মসজিদ খ্যাত ঐতিহাসিক আমর ইবনুল আ’স
মসজিদ পরিদর্শনের সুযোগ পাই। মিশরের রাজধানী কায়রো শহর প্রদক্ষিণকালে
আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো উক্ত মসজিদে। মহাবীর গাজী সালাউদ্দিন আইয়ুবী (রাহঃ)
এর দূর্গের সামান্য দূরেই এই মসজিদ। ইতিহাসের পাতা থেকে জানা যায় আফ্রিকা
মহাদেশের সর্বপ্রথম প্রতিষ্ঠিত এ-মসজিদটির নাম ‘আমর ইবনুল আ’স মসজিদ।’
প্রশস্ত রাস্তার পার্শ্বেই একটু নীচু অবস্থানে মসজিদটি অবস্থিত। নবী করীম
সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লামের শাসনামলেই হযরত আমর ইবনুল আ’স (রাঃ) কে
ওমান এলাকার শাসক নিযুক্ত করেছিলেন।
প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রাঃ) তাঁকে ওমান থেকে সরিয়ে ফিলিস্তিন এলাকায় প্রেরণ করেন। সিরিয়া বিজয় করে তিনি মিসর অভিযান চালানোর জন্য ২য় খলিফা হযরত ওমর (রাঃ) এর অনুমতি প্রার্থনা করেন। ইসলাম গ্রহণের পূর্বে তিনি একজন বড় ব্যবসায়ী ছিলেন এবং এ জন্যে মিশরে তাঁর যাতায়াত ছিল। পূর্ব অভিজ্ঞতার কারণে তিনি মিসর অভিযানের অনুমতি পান। হযরত আমর একটি ক্ষুদ্র বাহিনী নিয়ে মিসরের পথে রওয়ানা হলে তাঁকে সহায়তায় খলীফা ওমর (রাঃ) হযরত যুবাইর ইবনুল আওয়াম (রাঃ) এর নেতৃত্বে আরেকটি সাহায্যকারী বাহিনী পাঠান। হযরত আমর এই ফুসতাদ ও আশে পাশের এলাকা জয় করে এখানে তাঁবু স্থাপন করেন ও পরে খলিফার অনুমতি নিয়ে আলেকজান্দ্রিয়া বিজয় করেন। হযরত আমর মিসর বিজয় করে ২১ হিজরী মোতাবেক ৬৪২ খৃষ্টাব্দে ফুসতাদ নামক স্থানে মসজিদটি নির্মাণ করেন এবং একটি ইসলামী শিক্ষাকেন্দ্রও স্থাপন করেন। এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৫০০০ এর অধিক শিক্ষার্থী ছিল। ‘ফুসতাদ’ মানে হলো ‘তাঁবু’ সেখানে মিশর বিজয়ীরা তাঁবু গেড়েছিল বলে এ এলাকার নাম ফুসতাদ। হযরত আমর ইমনুল আ’স (রাঃ) এর ইন্তেকালের পর তাঁকে মিসরের মাকতাম নামক স্থানে দাফন করা হয়। প্রথমে প্রায় ১৫০০ বর্গহাত জায়গার উপর মসজিদটি স্থাপিত হয় । এই মসজিদে তখন মিনার ছিলো না, হযরত মুয়াবিয়া (রাঃ) এর নির্দেশে মিসরের পরবর্তী গভর্ণর হযরত মুসলিমা ইবনে মুখাল্লাদ (রাঃ) সর্বপ্রথম আযান দেয়ার জন্য মসজিদটিতে মিনার নির্মাণ করেন। পরবর্তীতে মিশরের বাদশাহ আবদুল আযিয ইবনে মারওয়ান ৬৯৮ খৃষ্টাব্দ মসজিদটি আরো বর্ধিত করেন। গাইড আহমেদ মসজিদটির ইতিহাস বর্ণনায় আরো বলেন, মিশরের যুবরাজ ক্বোরাহ ইবনে শওরাইক আল আবসী ৭১১ খৃষ্টাব্দে মসজিদটির সংস্কার সাধন করে এর সৌন্দর্য আরো বৃদ্ধি করেন। পরবর্তীতে খলীফা আল ওয়ালিদ ইবনে আবদুল মালিকের নির্দেশে কারুকার্য মন্ডিত কাঠের একটি মিনার নির্মাণ করা হয় এবং চারটি স্তম্ভে স্বর্ণের প্রলেপ দিয়ে সৌন্দর্য বর্ধন করা হয়। খলীফা মামুনের নির্দেশে মিসরের শাসক আব্দুল্লাহ ইবনে তাহির ৮২৭ খ্রিস্টাব্দে উত্তর পার্শ্বে মসজিদটিকে বর্ধিত করেন। বর্ধিত করার পরে মসজিদটির পরিমাণ দাঁড়ায় ১৩,৫৫৬,২৫ বর্গ মিটার। এ মসজিদের মধ্যে সাদা মার্বেল পাথরের ১৫০ টি স্তম্ভ রয়েছে এবং মিনার রয়েছে তিনটি। এই মসজিদ নির্মাণের পূর্বে কিবলা নির্ধারণের কাজে ৮০ জন সম্মানিত সাহাবায়ে কেরাম শামিল ছিলেন। এদের মধ্যে হযরত যুবায়ের ইবনুল আওয়াম, হযরত উবাদা ইবনুস সামিত, হযরত আবু দারদা এবং হযরত আবু যর গিফারী (রাঃ) এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই মসজিদের প্রথম ইমাম ছিলেন হযরত আমর স্বয়ং এবং হযরত আবু মুসলিম ইয়াফেয়ী (রাঃ) ছিলেন প্রথম মুয়াজ্জিন। ইসলামের স্বর্ণালী যুগের এই মসজিদেই বিচার বিভাগের কাজ সম্পন্ন করা হতো এবং এখানে নানা বিষয়ে মানুষকে শিক্ষা দেয়া হতো। মসজিদের প্রথম কাতারের বাম দিকে হযরত আমর আ’স (রাঃ) এর সন্তান হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ) মাজার রয়েছে। মসজিদের বিভিন্ন স্থানে বেশ কয়েকটি কাঠের মিম্বর আছে এবং মাঝের খোলা চত্বরটি সম্পুর্ণ মার্বেল পাথর দিয়ে মোড়ানো। মসজিদটি খুবই খোলামেলা, আলোকিত, দৃষ্টিনন্দন এবং আরামদায়ক ।
ঘুরে ঘুরে দেখলাম চমৎকার নির্মাণ শৈলীর এ মসজিদ। মসজিদের এক জায়গায় দেখলাম গোল করে বসে শিশুরা ওস্তাদকে ঘিরে কোরান তেলাওয়াত প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। মিশরীয়রা বরাবরই শুদ্ধ সুললিত কণ্ঠে তেলাওয়াতের জন্য বিখ্যাত। বিশ্ববরেণ্য ক্বারী আব্দুল বাসেত মিশরেরই সন্তান। ঐ মসজিদে আমরা সকলেই দু’ রাকাত দুখুলুল মসজিদ এর নামাজ আদায় করলাম । মসজিদের বাহিরে বহু বোরকা পরিহিতা নারীকে বসে বসে শোক প্রকাশরত দেখলাম । হয়তো কোন মৃত ব্যক্তির জন্য তারা এভাবে শোক প্রকাশ করছেন। আজহারী ভাই বললেন, এটা নাকি তাদের রেওয়াজ। মসজিদের গেটের একটি দোকান থেকে ঐতিহ্যবাহী মিশরীয় টুপি ও ফেজ টুপি ক্রয় করলাম । আমার নানা-দাদারা নাকি এরকম তুর্কী টুপি পড়তেন, তুর্কী সালতানাতের সমর্থনে। মসজিদটি প্রদক্ষিণ শেষে ওখান থেকে আমাদের প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) এর প্রিয় দৌহিত্র হযরত হাসান (রাঃ) এর মেয়ে হযরত নাসিফা (রাহঃ) এর নামে নির্মিত মসজিদে নিয়ে যাওয়া হলো। যেখানে তাঁর মাজারও রয়েছে। আখেরী নবী (সাঃ) এর প্রবাহিত রক্তের ফল্গু ধারা যে নারীর দেহে সে নবী (সাঃ) দৌহিত কন্যার কবর জেয়ারত পূর্বক বিশাল মসজিদটি ঘুরে ঘুরে দেখলাম।
মসজিদের ভেতরের দেয়ালে বিশাল বটবৃক্ষের মতো ডাল-পালায় লিখা আছে আখেরী নবী (সাঃ) এর বংশ তালিকা। এত অল্প সময়ে এ বিশাল ঐতিহ্যের ভা-ার দেখে শেষ করা যায় না। টিম লিডার থেকে আরো জানতে পারলাম, কায়রো শহরের উপকণ্ঠে কারাফাতা আছছুগরা কবর স্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন বিশ্ব বরেণ্য আলেমে দ্বীন ইমাম শাফেরী (রাহঃ) এর মাজার। পূর্ণ নাম আবু আবদুল্লাহ ইবনে ইদ্রীস (রাঃ)। তিনি সুন্নী মুসলমানগণের চার মাযহাবের অন্যতম শাফিঈ মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা। ফিলিস্তিনের অন্তর্গত গাজাতে কুরাইশ বংশে জন্মগ্রহণ করেন। মক্কা শরীফে হাদীস ও ফিকাহ শাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। মদীনাতে গিয়ে ইসলামের অপর মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম মালিকের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। রাজনৈতিক কারণে একবার তাঁকে বন্দী করা হয়। পরে খলীফা হারুনুর রশীদের নির্দেশে তিনি মুক্তি লাভ করেন এবং বাগদাদে গিয়ে বসবাস শুরু করেন। আজীবন কঠোর পরিশ্রম ও নিষ্ঠার সঙ্গে জ্ঞান সাধনা করে তিনি শরীয়তের আইনসমূহ প্রণয়ন করেন। তিনি আরবী সাহিত্যের একজন খ্যাতনামা কবিও বটে। জীবনের শেষভাগ মিসরে কাটান এবং ফুসতাদে তিনি ইন্তেকাল করেন। বংশগত দিক দিয়ে তাঁর সপ্তম পুরুষ নবী করিম সাঃ এর সাথে মিশে গেছে। ইমাম শাফেয়ী (রাঃ) মাত্র ৭ বছর বয়সে পবিত্র কোরানের হাফেজ হন এবং ১০ বছর বয়সে বিশাল হাদীস গ্রন্থ মুয়াত্তা ইমাম মালিক মুখস্ত করেন। ইমাম শাফেয়ীর রচনা সংখ্যা ১১৩ । উসুলে ফিকাহ্ এর প্রথম কিতাব ‘আর রিসালাহ’ তিনিই রচনা করেন। তিনি একাধারে কবি, সাহিত্যিক, মুহাদ্দিস, ফকীহ, আইনজ্ঞ, গবেষক ও শাফেয়ী মাযহাবের ইমাম ছিলেন। সময়ের অভাবে তার মাযার জেয়ারত করতে পারিনি। এখানে দেখার মতো আরেকটি প্রাচীন মসজিদ রয়েছে যার নাম মসজিদে সুলতান হাসান। এই মসজিদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় গাইড আমাদের বললেন ৭৫৭ হিজরী সালে সুলতান হাসান এ মসজিদটি নির্মাণ করেন।
তিনি অর্ধ শতাব্দী মিসরের শাসক ছিলেন। এই মসজিদ গোটা বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ট স্থাপত্যের নিদর্শন। এই মসজিদের সাথেই রয়েছে একটি বিশ্ববিদ্যালয়। মসজিদে সুলতান হাসানে ছাত্রদের থাকার জন্য রয়েছে ২৯০টি কক্ষ। হানাফী , মালেকী, হাম্বলী ও শাফেয়ী এ ৪ মাযহাবের ৪টি মাদ্রাসা ওখানে রয়েছে । দিনশেষে আমাদের টিম লিডার ড. বি এম মফিজুর রহমান আজহারী তার ছাত্রজীবনের পুরানো স্মৃতি বিজডিত এলাকা খান.এ. খলিলি মার্কেটে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করলেন। আমাদের সফর সঙ্গী নাক, কান গলা বিশেষজ্ঞ ডা. ওমর ফারুক, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী সেলিম উল্লাহ জামান তাঁর সাথে মার্কেটিং এর জন্য যেতে আগ্রহ প্রকাশ করলেন। বাস মার্কেটটির পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। আমি ও আমার শিশুপুত্র জাওয়াদ এবং ভগ্নিপতি এডভোকেট আনোয়ারসহ অন্যান্য সফর সঙ্গীরা খুবই ক্লান্ত ছিলাম। প্রফেসর শায়েস্তা খাঁ স্যারের স্ত্রী, কন্যা, নাতনি, শ্যালিকা একই পরিবারের ৬ জন যথাক্রমে মমতাজ খান, ফারজানা জেসমিন খান, নাবিলা রহমান, তানভীর আহমেদ সিদ্দিকী, মনোয়ারা বেগম, হোসনে আরা বেগম, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদালয়ের শারীরিক শিক্ষা বিভাগের পরিচালক জনাব মুহাম্মদ রুহুল আমিন খান ও তাঁর স্ত্রী জেবুন্নাহার বেগম (হাটহাজারী উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা) প্রমুখ আমার সাথে মার্কেটিং এ আপাততঃ না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন । অপর ৩ জন মার্কেটে নেমে গেলেন। গাড়ী থেকে উড়াল সড়ক হতে দেখছিলাম এটি একটি উন্মুক্ত বিপণী (সৌক), যা ১৩৮৫ সালে নির্মিত হয়েছিল, যখন আমির জারকাস ঈল-খালিলি এক বৃহৎ পান্থশালা নির্মাণ করেন।
এ বিপণী স্থলটি সুলতান আল ঘুরির দ্বারা ভূমিস্যাৎ করে দেয়া হয়েছিল এবং পরবর্তীকালে ষোড়শ শতকে এটিকে পুনঃনির্মিত করা হয়েছিল। ইসলামিয়া ও তুরস্কীয় মোটিফ (শিল্প ও সাহিত্যের বিশেষত সঙ্গীতের মূল উপাদান বা প্রধান প্রসঙ্গিত নকশায়িত প্রতীকী); যেমন- মামলুক শৈলীতে সুসজ্জিত প্রবেশদ্বারগুলি যথাযোগ্যভাবে সে যুগের মানুষের কারিগরিতাকে প্রদর্শিত করে। এটাকে ক্রেতাদের জন্য স্বর্গোদ্যান বলা হয়, যেখানে শিলারূপ মূর্তি, সৌখিন জিনিসপত্র, রূপোর গহনা এবং বেল্যী নৃত্যের পরিধান সমূহের নিদারুণ ভা-ার, এখানে মশলাবাজার দ্রব্যও কিনতে পারা যায়। ডা. ওমর ফারুক ভাই ওখান থেকে প্যাপিরাস ও শো পিস কিনেন। আমি তাঁকে দিয়ে আপনজনদের জন্য এক ডজন ঐতিহ্যবাহী মিশরী টুপি ক্রয় করি। সেখানে দাম অনেক কম দেখলাম। এই প্রাচীন মার্কেট এলাকার পার্শ্বেই আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচীন ক্যাম্পাস। বিশাল লাইব্রেরী ও দৃষ্টিনন্দন মসজিদ চোখে পড়লো। পরবর্তীতে আমাদের নতুন ক্যাম্পাসে নিয়ে যাওয়া হবে জানালেন গাইড আহমেদ। আমরা দিনের কর্মসূচী শেষে নির্ধারিত দ্য ওয়াসিস হোটেলে ফিরে গেলাম। পরের দিনের কর্মসূচী নিয়ে পরবর্তী সংখ্যায় আরো মনোজ্ঞ আলোচনা আশা রাখি ।
লেখক : আইনজীবী, কলামিস্ট, মানবাধিকার ও সুশাসনকর্মী ।
প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রাঃ) তাঁকে ওমান থেকে সরিয়ে ফিলিস্তিন এলাকায় প্রেরণ করেন। সিরিয়া বিজয় করে তিনি মিসর অভিযান চালানোর জন্য ২য় খলিফা হযরত ওমর (রাঃ) এর অনুমতি প্রার্থনা করেন। ইসলাম গ্রহণের পূর্বে তিনি একজন বড় ব্যবসায়ী ছিলেন এবং এ জন্যে মিশরে তাঁর যাতায়াত ছিল। পূর্ব অভিজ্ঞতার কারণে তিনি মিসর অভিযানের অনুমতি পান। হযরত আমর একটি ক্ষুদ্র বাহিনী নিয়ে মিসরের পথে রওয়ানা হলে তাঁকে সহায়তায় খলীফা ওমর (রাঃ) হযরত যুবাইর ইবনুল আওয়াম (রাঃ) এর নেতৃত্বে আরেকটি সাহায্যকারী বাহিনী পাঠান। হযরত আমর এই ফুসতাদ ও আশে পাশের এলাকা জয় করে এখানে তাঁবু স্থাপন করেন ও পরে খলিফার অনুমতি নিয়ে আলেকজান্দ্রিয়া বিজয় করেন। হযরত আমর মিসর বিজয় করে ২১ হিজরী মোতাবেক ৬৪২ খৃষ্টাব্দে ফুসতাদ নামক স্থানে মসজিদটি নির্মাণ করেন এবং একটি ইসলামী শিক্ষাকেন্দ্রও স্থাপন করেন। এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৫০০০ এর অধিক শিক্ষার্থী ছিল। ‘ফুসতাদ’ মানে হলো ‘তাঁবু’ সেখানে মিশর বিজয়ীরা তাঁবু গেড়েছিল বলে এ এলাকার নাম ফুসতাদ। হযরত আমর ইমনুল আ’স (রাঃ) এর ইন্তেকালের পর তাঁকে মিসরের মাকতাম নামক স্থানে দাফন করা হয়। প্রথমে প্রায় ১৫০০ বর্গহাত জায়গার উপর মসজিদটি স্থাপিত হয় । এই মসজিদে তখন মিনার ছিলো না, হযরত মুয়াবিয়া (রাঃ) এর নির্দেশে মিসরের পরবর্তী গভর্ণর হযরত মুসলিমা ইবনে মুখাল্লাদ (রাঃ) সর্বপ্রথম আযান দেয়ার জন্য মসজিদটিতে মিনার নির্মাণ করেন। পরবর্তীতে মিশরের বাদশাহ আবদুল আযিয ইবনে মারওয়ান ৬৯৮ খৃষ্টাব্দ মসজিদটি আরো বর্ধিত করেন। গাইড আহমেদ মসজিদটির ইতিহাস বর্ণনায় আরো বলেন, মিশরের যুবরাজ ক্বোরাহ ইবনে শওরাইক আল আবসী ৭১১ খৃষ্টাব্দে মসজিদটির সংস্কার সাধন করে এর সৌন্দর্য আরো বৃদ্ধি করেন। পরবর্তীতে খলীফা আল ওয়ালিদ ইবনে আবদুল মালিকের নির্দেশে কারুকার্য মন্ডিত কাঠের একটি মিনার নির্মাণ করা হয় এবং চারটি স্তম্ভে স্বর্ণের প্রলেপ দিয়ে সৌন্দর্য বর্ধন করা হয়। খলীফা মামুনের নির্দেশে মিসরের শাসক আব্দুল্লাহ ইবনে তাহির ৮২৭ খ্রিস্টাব্দে উত্তর পার্শ্বে মসজিদটিকে বর্ধিত করেন। বর্ধিত করার পরে মসজিদটির পরিমাণ দাঁড়ায় ১৩,৫৫৬,২৫ বর্গ মিটার। এ মসজিদের মধ্যে সাদা মার্বেল পাথরের ১৫০ টি স্তম্ভ রয়েছে এবং মিনার রয়েছে তিনটি। এই মসজিদ নির্মাণের পূর্বে কিবলা নির্ধারণের কাজে ৮০ জন সম্মানিত সাহাবায়ে কেরাম শামিল ছিলেন। এদের মধ্যে হযরত যুবায়ের ইবনুল আওয়াম, হযরত উবাদা ইবনুস সামিত, হযরত আবু দারদা এবং হযরত আবু যর গিফারী (রাঃ) এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই মসজিদের প্রথম ইমাম ছিলেন হযরত আমর স্বয়ং এবং হযরত আবু মুসলিম ইয়াফেয়ী (রাঃ) ছিলেন প্রথম মুয়াজ্জিন। ইসলামের স্বর্ণালী যুগের এই মসজিদেই বিচার বিভাগের কাজ সম্পন্ন করা হতো এবং এখানে নানা বিষয়ে মানুষকে শিক্ষা দেয়া হতো। মসজিদের প্রথম কাতারের বাম দিকে হযরত আমর আ’স (রাঃ) এর সন্তান হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ) মাজার রয়েছে। মসজিদের বিভিন্ন স্থানে বেশ কয়েকটি কাঠের মিম্বর আছে এবং মাঝের খোলা চত্বরটি সম্পুর্ণ মার্বেল পাথর দিয়ে মোড়ানো। মসজিদটি খুবই খোলামেলা, আলোকিত, দৃষ্টিনন্দন এবং আরামদায়ক ।
ঘুরে ঘুরে দেখলাম চমৎকার নির্মাণ শৈলীর এ মসজিদ। মসজিদের এক জায়গায় দেখলাম গোল করে বসে শিশুরা ওস্তাদকে ঘিরে কোরান তেলাওয়াত প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। মিশরীয়রা বরাবরই শুদ্ধ সুললিত কণ্ঠে তেলাওয়াতের জন্য বিখ্যাত। বিশ্ববরেণ্য ক্বারী আব্দুল বাসেত মিশরেরই সন্তান। ঐ মসজিদে আমরা সকলেই দু’ রাকাত দুখুলুল মসজিদ এর নামাজ আদায় করলাম । মসজিদের বাহিরে বহু বোরকা পরিহিতা নারীকে বসে বসে শোক প্রকাশরত দেখলাম । হয়তো কোন মৃত ব্যক্তির জন্য তারা এভাবে শোক প্রকাশ করছেন। আজহারী ভাই বললেন, এটা নাকি তাদের রেওয়াজ। মসজিদের গেটের একটি দোকান থেকে ঐতিহ্যবাহী মিশরীয় টুপি ও ফেজ টুপি ক্রয় করলাম । আমার নানা-দাদারা নাকি এরকম তুর্কী টুপি পড়তেন, তুর্কী সালতানাতের সমর্থনে। মসজিদটি প্রদক্ষিণ শেষে ওখান থেকে আমাদের প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) এর প্রিয় দৌহিত্র হযরত হাসান (রাঃ) এর মেয়ে হযরত নাসিফা (রাহঃ) এর নামে নির্মিত মসজিদে নিয়ে যাওয়া হলো। যেখানে তাঁর মাজারও রয়েছে। আখেরী নবী (সাঃ) এর প্রবাহিত রক্তের ফল্গু ধারা যে নারীর দেহে সে নবী (সাঃ) দৌহিত কন্যার কবর জেয়ারত পূর্বক বিশাল মসজিদটি ঘুরে ঘুরে দেখলাম।
মসজিদের ভেতরের দেয়ালে বিশাল বটবৃক্ষের মতো ডাল-পালায় লিখা আছে আখেরী নবী (সাঃ) এর বংশ তালিকা। এত অল্প সময়ে এ বিশাল ঐতিহ্যের ভা-ার দেখে শেষ করা যায় না। টিম লিডার থেকে আরো জানতে পারলাম, কায়রো শহরের উপকণ্ঠে কারাফাতা আছছুগরা কবর স্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন বিশ্ব বরেণ্য আলেমে দ্বীন ইমাম শাফেরী (রাহঃ) এর মাজার। পূর্ণ নাম আবু আবদুল্লাহ ইবনে ইদ্রীস (রাঃ)। তিনি সুন্নী মুসলমানগণের চার মাযহাবের অন্যতম শাফিঈ মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা। ফিলিস্তিনের অন্তর্গত গাজাতে কুরাইশ বংশে জন্মগ্রহণ করেন। মক্কা শরীফে হাদীস ও ফিকাহ শাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। মদীনাতে গিয়ে ইসলামের অপর মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম মালিকের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। রাজনৈতিক কারণে একবার তাঁকে বন্দী করা হয়। পরে খলীফা হারুনুর রশীদের নির্দেশে তিনি মুক্তি লাভ করেন এবং বাগদাদে গিয়ে বসবাস শুরু করেন। আজীবন কঠোর পরিশ্রম ও নিষ্ঠার সঙ্গে জ্ঞান সাধনা করে তিনি শরীয়তের আইনসমূহ প্রণয়ন করেন। তিনি আরবী সাহিত্যের একজন খ্যাতনামা কবিও বটে। জীবনের শেষভাগ মিসরে কাটান এবং ফুসতাদে তিনি ইন্তেকাল করেন। বংশগত দিক দিয়ে তাঁর সপ্তম পুরুষ নবী করিম সাঃ এর সাথে মিশে গেছে। ইমাম শাফেয়ী (রাঃ) মাত্র ৭ বছর বয়সে পবিত্র কোরানের হাফেজ হন এবং ১০ বছর বয়সে বিশাল হাদীস গ্রন্থ মুয়াত্তা ইমাম মালিক মুখস্ত করেন। ইমাম শাফেয়ীর রচনা সংখ্যা ১১৩ । উসুলে ফিকাহ্ এর প্রথম কিতাব ‘আর রিসালাহ’ তিনিই রচনা করেন। তিনি একাধারে কবি, সাহিত্যিক, মুহাদ্দিস, ফকীহ, আইনজ্ঞ, গবেষক ও শাফেয়ী মাযহাবের ইমাম ছিলেন। সময়ের অভাবে তার মাযার জেয়ারত করতে পারিনি। এখানে দেখার মতো আরেকটি প্রাচীন মসজিদ রয়েছে যার নাম মসজিদে সুলতান হাসান। এই মসজিদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় গাইড আমাদের বললেন ৭৫৭ হিজরী সালে সুলতান হাসান এ মসজিদটি নির্মাণ করেন।
তিনি অর্ধ শতাব্দী মিসরের শাসক ছিলেন। এই মসজিদ গোটা বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ট স্থাপত্যের নিদর্শন। এই মসজিদের সাথেই রয়েছে একটি বিশ্ববিদ্যালয়। মসজিদে সুলতান হাসানে ছাত্রদের থাকার জন্য রয়েছে ২৯০টি কক্ষ। হানাফী , মালেকী, হাম্বলী ও শাফেয়ী এ ৪ মাযহাবের ৪টি মাদ্রাসা ওখানে রয়েছে । দিনশেষে আমাদের টিম লিডার ড. বি এম মফিজুর রহমান আজহারী তার ছাত্রজীবনের পুরানো স্মৃতি বিজডিত এলাকা খান.এ. খলিলি মার্কেটে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করলেন। আমাদের সফর সঙ্গী নাক, কান গলা বিশেষজ্ঞ ডা. ওমর ফারুক, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী সেলিম উল্লাহ জামান তাঁর সাথে মার্কেটিং এর জন্য যেতে আগ্রহ প্রকাশ করলেন। বাস মার্কেটটির পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। আমি ও আমার শিশুপুত্র জাওয়াদ এবং ভগ্নিপতি এডভোকেট আনোয়ারসহ অন্যান্য সফর সঙ্গীরা খুবই ক্লান্ত ছিলাম। প্রফেসর শায়েস্তা খাঁ স্যারের স্ত্রী, কন্যা, নাতনি, শ্যালিকা একই পরিবারের ৬ জন যথাক্রমে মমতাজ খান, ফারজানা জেসমিন খান, নাবিলা রহমান, তানভীর আহমেদ সিদ্দিকী, মনোয়ারা বেগম, হোসনে আরা বেগম, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদালয়ের শারীরিক শিক্ষা বিভাগের পরিচালক জনাব মুহাম্মদ রুহুল আমিন খান ও তাঁর স্ত্রী জেবুন্নাহার বেগম (হাটহাজারী উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা) প্রমুখ আমার সাথে মার্কেটিং এ আপাততঃ না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন । অপর ৩ জন মার্কেটে নেমে গেলেন। গাড়ী থেকে উড়াল সড়ক হতে দেখছিলাম এটি একটি উন্মুক্ত বিপণী (সৌক), যা ১৩৮৫ সালে নির্মিত হয়েছিল, যখন আমির জারকাস ঈল-খালিলি এক বৃহৎ পান্থশালা নির্মাণ করেন।
এ বিপণী স্থলটি সুলতান আল ঘুরির দ্বারা ভূমিস্যাৎ করে দেয়া হয়েছিল এবং পরবর্তীকালে ষোড়শ শতকে এটিকে পুনঃনির্মিত করা হয়েছিল। ইসলামিয়া ও তুরস্কীয় মোটিফ (শিল্প ও সাহিত্যের বিশেষত সঙ্গীতের মূল উপাদান বা প্রধান প্রসঙ্গিত নকশায়িত প্রতীকী); যেমন- মামলুক শৈলীতে সুসজ্জিত প্রবেশদ্বারগুলি যথাযোগ্যভাবে সে যুগের মানুষের কারিগরিতাকে প্রদর্শিত করে। এটাকে ক্রেতাদের জন্য স্বর্গোদ্যান বলা হয়, যেখানে শিলারূপ মূর্তি, সৌখিন জিনিসপত্র, রূপোর গহনা এবং বেল্যী নৃত্যের পরিধান সমূহের নিদারুণ ভা-ার, এখানে মশলাবাজার দ্রব্যও কিনতে পারা যায়। ডা. ওমর ফারুক ভাই ওখান থেকে প্যাপিরাস ও শো পিস কিনেন। আমি তাঁকে দিয়ে আপনজনদের জন্য এক ডজন ঐতিহ্যবাহী মিশরী টুপি ক্রয় করি। সেখানে দাম অনেক কম দেখলাম। এই প্রাচীন মার্কেট এলাকার পার্শ্বেই আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচীন ক্যাম্পাস। বিশাল লাইব্রেরী ও দৃষ্টিনন্দন মসজিদ চোখে পড়লো। পরবর্তীতে আমাদের নতুন ক্যাম্পাসে নিয়ে যাওয়া হবে জানালেন গাইড আহমেদ। আমরা দিনের কর্মসূচী শেষে নির্ধারিত দ্য ওয়াসিস হোটেলে ফিরে গেলাম। পরের দিনের কর্মসূচী নিয়ে পরবর্তী সংখ্যায় আরো মনোজ্ঞ আলোচনা আশা রাখি ।
লেখক : আইনজীবী, কলামিস্ট, মানবাধিকার ও সুশাসনকর্মী ।

Post a Comment